ইসলামে সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার দায়িত্ব ও কর্তব্য: কোরআন ও হাদিসের আলোকে

সন্তানের প্রতি পিতা মাতার দায়িত্ব ও কর্তব্য ইসলাম ধর্মে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি পিতা-মাতার দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোরআন এবং হাদিসে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, যা প্রতিটি মুসলিম পরিবারকে একটি সুস্থ, সুন্দর ও নৈতিকভাবে সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তুলতে সহায়তা করে।

১. সুশিক্ষা প্রদান

ইসলামে জ্ঞানের গুরুত্ব অপরিসীম। কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন” (সূরা আলাক, ৯৬:১)। এ আয়াত থেকে বুঝা যায় যে জ্ঞান অর্জন প্রতিটি মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পিতা-মাতার প্রধান দায়িত্ব সন্তানের জন্য একটি সঠিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা। ইসলামে শুধু সাধারণ শিক্ষাই নয়, নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষাও সমান গুরুত্বের। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “প্রত্যেক সন্তান জন্মগ্রহণ করে ফিতরাত বা প্রাকৃতিক ধর্মের উপর; পরে তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদি, নাসারা বা মজুসী বানিয়ে ফেলে” (সহীহ মুসলিম)। তাই পিতা-মাতার দায়িত্ব হল সন্তানকে ইসলামের নৈতিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করা।

২. সন্তানের প্রতি পিতা মাতার দায়িত্ব ও কর্তব্য আখলাক বা চরিত্র গঠন

সন্তানের সুশিক্ষার পাশাপাশি তাদের আখলাক বা চরিত্র গঠনেও ইসলামে পিতা-মাতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পিতা-মাতার উচিত তাদের সন্তানকে সুন্দর চরিত্রের অধিকারী হিসেবে গড়ে তোলা, যেন তারা সত্যবাদী, সৎ, দয়ালু ও দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে উঠতে পারে। কোরআনে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আপনি (রাসূল) মহান চরিত্রের অধিকারী” (সূরা আল-কলাম, ৬৮:৪)। রাসূলুল্লাহ (সা.) সর্বোত্তম চরিত্রের আদর্শ ছিলেন, এবং পিতা-মাতার উচিত এই আদর্শকে সন্তানের মধ্যে প্রোথিত করা।

৩. নামের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা

সন্তানের জন্মের পর তার জন্য একটি সুন্দর ও অর্থবহ নাম রাখা ইসলামে পিতা-মাতার অন্যতম কর্তব্য। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের সন্তানদের সুন্দর নাম রাখো, কারণ তোমরা কিয়ামতের দিন তাদের নাম দিয়ে ডাকা হবে” (আবু দাউদ)। নামের মাধ্যমে সন্তানকে পরিচয় প্রদান করা এবং তাদের উপর ভাল প্রভাব ফেলা যায়। তাই নাম রাখার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৪. ভালোবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শন

শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য পিতা-মাতার ভালোবাসা ও যত্ন অপরিহার্য। রাসূলুল্লাহ (সা.) ছোটদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন এবং শিশুদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনের জন্য উৎসাহিত করতেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, একবার এক বেদুইন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনলেন, “তোমরা কি তোমাদের সন্তানদের চুম্বন করো? আমি তো আমার দশ সন্তানকে কখনও চুম্বন করিনি!” তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “যে ব্যক্তি দয়া করে না, তার উপরও দয়া করা হয় না” (সহীহ বুখারি)। পিতা-মাতার ভালবাসা সন্তানদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে এবং তাদেরকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখতে সহায়ক।

৫. ইসলামিক আচার-আচরণ শেখানো

ইসলামে প্রতিটি মুসলিমের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কিছু আচার-আচরণ অনুসরণ করতে বলা হয়েছে, যা সন্তানদের শিখিয়ে দেওয়া পিতা-মাতার দায়িত্ব। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও এবং দশ বছর বয়সে নামাজের জন্য শাসন কর” (আবু দাউদ)। এই হাদিস থেকে স্পষ্ট যে, পিতা-মাতার দায়িত্ব হল শিশুদের ধর্মীয় বিধান মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তোলা। বিশেষ করে, ছোটবেলা থেকেই তাদের নামাজ, রোজা, এবং ইসলামের অন্যান্য ফরজ বিধান পালনের শিক্ষা দেওয়া।

৬. সন্তানদের প্রতি ন্যায়বিচার করা

ইসলামে সন্তানদের প্রতি ন্যায়বিচার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পিতা-মাতার উচিত তাদের সমস্ত সন্তানদের সমান ভালোবাসা এবং যত্ন দেওয়া। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো” (সহীহ বুখারি)। সন্তানদের মধ্যে কোনরকম পক্ষপাতিত্ব করা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। এতে সন্তানদের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ এবং মানসিক চাপের সৃষ্টি হতে পারে।

৭. দোয়া করা

পিতা-মাতার দায়িত্বের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল তাদের সন্তানদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা। কোরআনে বলা হয়েছে, “হে আমার পালনকর্তা! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সব মুমিনকে সেই দিন ক্ষমা করো, যেদিন হিসাব নেওয়া হবে” (সূরা ইব্রাহীম, ১৪:৪১)। পিতা-মাতার দোয়া সন্তানের জন্য এক মূল্যবান সম্পদ।